বিভাগ: আন্তর্জাতিক
মোট খবর: 2 টি
পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ: সমস্যার চেয়ে বড় হয়ে উঠছে দায় চাপানোর রাজনীতি
পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদ নতুন কোনো সমস্যা নয়। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে বছরের পর বছর ধরে জঙ্গি হামলা, বিচ্ছিন্নতাবাদ, সামরিক অভিযান ও রাজনৈতিক সহিংসতা চলছে। এসবের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। তাই সন্ত্রাসবাদের দায় কোনো নির্দিষ্ট প্রদেশ, জাতিগোষ্ঠী বা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া সমস্যার প্রকৃত কারণকে আড়াল করতে পারে। মরিয়ম নওয়াজের বক্তব্যের পেছনে পাঞ্জাবের একটি বাস্তব নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকতে পারে। বিভিন্ন সময় জঙ্গি ও অপরাধী চক্র প্রাদেশিক সীমান্ত ব্যবহার করে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে প্রবেশ করেছে। তবে কোনো অঞ্চলের ভেতর দিয়ে জঙ্গিদের চলাচল করা আর সেই অঞ্চলের মানুষকে সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে এক করে দেখা—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া, বেলুচিস্তান, সিন্ধ ও পাঞ্জাব—প্রতিটি প্রদেশেরই নিজস্ব রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বাস্তবতা রয়েছে। বিশেষ করে খাইবার পাখতুনখোয়া দীর্ঘদিন ধরে জঙ্গিবাদ ও সামরিক অভিযানের বড় ধরনের চাপ বহন করে আসছে। বেলুচিস্তানে রয়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদ, রাজনৈতিক অসন্তোষ, সম্পদ বণ্টন নিয়ে বিরোধ এবং কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। ফলে কোনো একটি প্রদেশকে সন্ত্রাসবাদের উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ সমস্যার শিকড় শুধু বর্তমানের জঙ্গি তৎপরতায় সীমাবদ্ধ নয়। দেশটির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নীতিতে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনকে একভাবে দেখা হয়নি—এমন অভিযোগ বহু বছর ধরে রয়েছে। কিছু সংগঠনকে কৌশলগত স্বার্থে ব্যবহার করা হয়েছে, আবার অন্য সংগঠনগুলো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। ভারত ও কাশ্মীরকেন্দ্রিক বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এমন দ্বৈত নীতির অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীকে রাজনৈতিক বা কৌশলগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার পর সেটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সব সময় সম্ভব হয় না। সময়ের সঙ্গে এসব সংগঠন নিজেদের লক্ষ্য ও স্বার্থ অনুযায়ী পরিচালিত হতে পারে। তখন তারা যে রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থে একসময় ব্যবহৃত হয়েছিল, সেই রাষ্ট্রের জন্যই নিরাপত্তা হুমকি হয়ে উঠতে পারে। লস্কর-ই-তাইয়েবা ও জইশ-ই-মোহাম্মদের মতো সংগঠনের উত্থানও কোনো প্রাদেশিক সীমান্তের আকস্মিক ঘটনা নয়। এসব সংগঠন এমন একটি রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিবেশে বিকশিত হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি এক ছিল না। পাকিস্তানের বর্তমান সন্ত্রাসবাদ সংকট বুঝতে হলে এই ইতিহাসকে বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের সঙ্গে ১৯৭১ সালের ইতিহাসের সরাসরি তুলনা করা না হলেও ওই সময়ের ঘটনাগুলো থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক বৈষম্য ক্রমে প্রকট হয়। জনসংখ্যায় সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের যথাযথ প্রতিনিধিত্ব দেখতে পায়নি। সামরিক ও আমলাতান্ত্রিক কাঠামোয় পশ্চিম পাকিস্তানের প্রভাব ছিল বেশি। অর্থনৈতিক বৈষম্যও অসন্তোষ বাড়ায়। পূর্ব পাকিস্তান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও উন্নয়ন ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের বণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ছিল। এসব বৈষম্য ধীরে ধীরে রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে শক্তিশালী করে। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও সেই নির্বাচনের ফল অনুযায়ী ক্ষমতা হস্তান্তর হয়নি। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়া এবং রাজনৈতিক সমাধানে ব্যর্থতার পর পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে যায়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—শুধু শক্তি প্রয়োগ করে দীর্ঘদিন রাজনৈতিক অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার ও সমান মর্যাদা নিশ্চিত না হলে রাষ্ট্রের ভেতরে অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। কোনো প্রদেশের জনগণকে জঙ্গি বা বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন অন্যায়, তেমনি একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক অসন্তোষকে শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা হিসেবে দেখা সমস্যাটিকে আরও জটিল করতে পারে। খাইবার পাখতুনখোয়ার মানুষ জঙ্গি নন। বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষও সেখানে সক্রিয় কোনো সশস্ত্র সংগঠনের সমার্থক নন। একইভাবে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক নীতির দীর্ঘ ইতিহাসের দায় সাধারণ পাঞ্জাবিদের ওপরও চাপানো যায় না। রাষ্ট্রের নীতি ও সাধারণ মানুষের পরিচয় এক বিষয় নয়—এই পার্থক্যটি পাকিস্তানের রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ। সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় পাকিস্তানের সামনে সবচেয়ে বড় নীতিগত প্রশ্নগুলোর একটি হলো—সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে কি একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হবে? কোনো সংগঠন বিদেশি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালালে তাকে সহনীয় হিসেবে দেখা হবে, আর একই ধরনের সংগঠন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরলে তাকে সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করা হবে—এমন নীতি দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর হতে পারে না। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কার্যকর অবস্থান নিতে হলে সংগঠনটির লক্ষ্য বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং তার সহিংস কর্মকাণ্ড ও আইনের অবস্থানকে বিবেচনায় নিতে হবে। সব ধরনের সশস্ত্র উগ্রবাদী সংগঠনের বিরুদ্ধে একই আইনি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োগ করাই টেকসই পথ। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান প্রয়োজন হতে পারে। জঙ্গি নেটওয়ার্ক ধ্বংস, অর্থায়নের উৎস বন্ধ, অস্ত্র সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা জরুরি। তবে শুধু সামরিক ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি নিশ্চিত করা কঠিন। এর পাশাপাশি প্রয়োজন রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, কার্যকর ফেডারেল কাঠামো, ন্যায়সংগত অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং প্রাদেশিক পর্যায়ে জনগণের আস্থা অর্জন। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দেশের সব জনগোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে বিচ্ছিন্নতা ও অবিশ্বাসের জায়গা সংকুচিত হতে পারে। পাকিস্তানের ইতিহাস দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সংকটকে শুধু নিরাপত্তার সমস্যা হিসেবে দেখলে তার সমাধান দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ১৯৭১ সালের অভিজ্ঞতা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পাঞ্জাবে অন্য প্রদেশ থেকে জঙ্গিদের প্রবেশের ঘটনা থাকলে সেটি অবশ্যই নিরাপত্তা সংস্থার জন্য উদ্বেগের বিষয়। কিন্তু প্রাদেশিক সীমান্তকে পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদের মূল কারণ হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতর দিকগুলো উপেক্ষিত থাকবে। পাকিস্তানের সন্ত্রাসবাদ কোনো এক প্রদেশের তৈরি সমস্যা নয়। এর পেছনে রয়েছে জঙ্গি নেটওয়ার্ক, দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা নীতি, রাজনৈতিক বঞ্চনা, অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্বল রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সময়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীকে ঘিরে রাষ্ট্রীয় কৌশলের জটিল ইতিহাস। তাই সমাধানের পথও প্রাদেশিক বিভাজনে নয়। পাকিস্তানের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি হলো—সব নাগরিককে সমান মর্যাদা দেওয়া, সব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একই নীতি গ্রহণ করা এবং রাজনৈতিক আস্থা পুনর্গঠন করা। একটি রাষ্ট্র শুধু তার সীমান্ত রক্ষা করেই নিরাপদ হয় না; নাগরিকদের আস্থাও অর্জন করতে হয়। পাকিস্তানের জন্য ১৯৭১ সালের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই।

আমেরিকা কঠিন করল আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপ
যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপে বিধিনিষেধ জারি করেছে। ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট কিছু ইন্টার্নশিপের অনুমোদন সীমিত করতে নিজ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি নির্দেশ জারি করেছে বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন। সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে যে, এই নির্দেশনা না মানলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির অনুমোদন বাতিল হতে পারে। ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সম্প্রতি কারিকুলার প্র্যাকটিক্যাল ট্রেনিং বা সিপিটির অনুমোদন বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি সরকারের নজরে এসেছে। সিপিটির আওতায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা তাঁদের পাঠ্যক্রমের অংশ হিসেবে ইন্টার্নশিপ বা প্রশিক্ষণমূলক কাজে অংশ নিতে পারেন। তবে আমেরিকার কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষ্য, সম্প্রতি দেওয়া কিছু অনুমোদন প্রচলিত নিয়মের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। নিয়ম অনুযায়ী, প্রশিক্ষণটি কোনো প্রতিষ্ঠিত পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হলেই কেবল সিপিটির অনুমোদন দেওয়া যায়।